শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণ এক হও

ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ

জাসদের গঠন এবং আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গী
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দল নয়, একটি আন্দোলন। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাসদের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অতীত আছে। সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলার জনগণ, বাঙালি জাতি স্বাধীন আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে বিকাশের সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার জাতি সমূহের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি জাতি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ৪০ এর দশকে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়কালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ ক্ষমতা দখলের কৌশল হিসাবে ‘অখন্ড ভারত তত্ত্ব’, ‘ভারতীয় এক জাতি তত্ত্ব’, দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ এর ডামাডোল তৈরি করে বাংলা ও বাঙালিকে বিভক্ত করে। পূর্ব বাংলা বাঙালিদের ঘাড়ে পাকিস্তানী প্রায়োপনিবিশক শাসন চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার বাঙালিরা পাকিস্তানের প্রয়োপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভাষা, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনা করে। ৬০ এর দশকে তৎকালীন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গঠিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, যা স্বাধীনতা নিউক্লিয়াস নামে পরিচিত বাঙালি জাতির জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে স্বাধীন বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে পরিণত করে। তৎকালীন বিশ্বের দেশে দেশে সাম্রাজবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্যে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে একটি অগ্রণী ও বিপ্লবী ধারা সৃষ্টি হয়। বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের গর্ভে জন্ম নেয়া স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী ধারাই ভবিষ্যৎ জাসদের ভ্রুণ হিসাবে সৃষ্টি ও বিকশিত হয়। বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ধারায় ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পূর্ব বাংলার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও স্বাধীকার সম্বলিত ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচিভিত্তিক গণআন্দোলন, ১৯৬৯ সালে ছয় দফা ও ছাত্র সমাজের এগার দফা ভিত্তিক গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গণরায়, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগ কর্তৃক স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ইত্যাদি ঘটনার বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ধারায় ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে জাসদের জন্ম হয়। জাসদের এ ঐতিহাসিক জন্ম প্রক্রিয়ার কারণে সহজাতভাবেই যে কোন ধরনের বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন, অন্যায়, অত্যাচার, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, স্বৈরতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা সহ সকল প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে মানুষের মর্যাদা, অধিকার গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মনুষত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীলতা জাসদের নিত্য আদর্শে পরিণত হয়। এ আদর্শ জাসদকে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিচালিত করে।

সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়ে বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের রেখে যাওয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্র-প্রশাসন আইন দিয়ে দলীয় শাসন শুরু করে। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রতিবাদে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ত্যাগ করে ছাত্র-যুব নেতৃত্ব জনগণের কাতারে দাঁড়ায়।

এই দেশপ্রেমিক বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধারা সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে উপনিবেশিক রাষ্ট্র-প্রশাসন-আইন-কানুন এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাসদ গড়ে তোলেন।
নিজস্ব আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি এবং বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জাসদ সাম্যবাদী বিশ্ব দর্শণ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে দলের দর্শণ হিসাবে ধারণ করে। জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে কোন আপ্ত বাক্য হিসাবে না নিয়ে, কর্মের পথ নির্দেশ হিসাবে গ্রহণ করে। জাতীয় বাস্তবতার আলোকে দর্শণের সৃজনশীল চর্চা ও প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালায়। জাসদ একমাত্র দল যে দল গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের দর্শন ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে একটি জনপ্রিয় দর্শণ ও আন্দোলনে পরিণত করে। লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী তরুণ-যুবককে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র দর্শন জাসদ জনগণের উপর সকল ধরনের অন্যায়-অত্যাচার-শাসন-শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের পথে পরিচালিত করে। তাই জাসদই একমাত্র দল, যে দল ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও মোহ ত্যাগ করে দলীয় স্বৈরাচার, সামরিক স্বৈরাচার সহ শাসক গোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লাগাতার আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনার স্পর্ধা দেখায়। সংগ্রামের রাজপথে জাসদের নেতা-কর্মীদের যে পরিমাণ রক্ত, ঘাম, অশ্র“ ঝরেছে, তার তুলনা নেই, সব দল মিলিয়েও দেশের জন্য তার সামান্যতম অংশ ত্যাগ স্বীকার করেনি।

আজ যখন ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী, দলের ক্ষমতার জন্য নীতিহীন ক্ষমতাবাজীর রাজনীতির প্রাধান্য নীতি আদর্শের কবর দেয়া হচ্ছে তখনও জাসদ নীতি ও আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে জনগণের অধিকার ও মুক্ত সংগ্রামের পথে অবিচল। জাসদের এই নীতিগত ও আদর্শগত প্রেরণার উৎস বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। তাই এত অত্যাচার, নির্যাতন, ক্ষয়ক্ষতি, বিপর্যয়, লোভ-মোহ, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবেলা করেও জাসদ জনতার সংগ্রামের পথে অবিচল।

যখন সারা বিশ্বে, বাজার অর্থনীতির স্বপক্ষে মহা শোরগোল সৃষ্টি করা হয়েছে, বাজার অর্থনীতিই ইতিহাসের শেষ কথা, এরপর আর কিছুই নেই, বলে প্রচার করা হচ্ছে তখনও জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা জ্ঞাপন করে। জাসদ সমাজদর্শণ বিহীন ব্যক্তি স্বার্থপরতা, মুনাফা লোভ নির্ভর বাজার অর্থনীতির দর্শণকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জাসদ মনে করে মানুষের মর্যাদা, অধিকার রক্ষায় সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। বাজারের মুনাফার লোভ ও লাভের কাছে মানুষের মানবিক অস্তিত্ব বিকিয়ে দেয়া যায় না। মানুষের মানবিক অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকার নির্দেশ দেয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে ধারণ করে মানুষের মানবিক অস্তিত্ব রক্ষা ও মানবিক সমাজ ও সভ্যতার সংগ্রামে এগিয়ে চলতে বদ্ধ পরিকর।

সভ্যতার বিকাশ ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
মানব সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই মানুষের জীবনকে আরও উন্নত ও পৃথিবীকে মানুষের আরও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চলছে। এ সংগ্রামের অংশ হিসাবেই জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ধারাবহিক বিকাশ হয়ে আসছে। মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা ও উৎপাদন শক্তি বাড়ছে। সামাজিক উৎপাদনের বিকাশের ধারায় গড়ে ওঠে নতুন শ্রেণী,নতুন সমাজ শক্তি, নতুন সমাজ চেতনা, নতুন রাজনৈতিক চেতনা। পুরাতন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে বিকাশমান সমাজ চেতনা ও সমাজশক্তির বিরোধ-সংঘাতের ধারায় সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। সমাজ নতুন উন্নত বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়। নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তির ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। সমাজ বিকাশের এই ঐতিহাসিক ও অমোঘ নিয়মেই সমগ্র মানব সমাজ ও বিশ্ব সভ্যতা পরিবর্তনের কালপর্ব অতিক্রম করছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানব সভ্যতার সামনে অসীম সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছে। মানুষেল উৎপাদন ক্ষমতা ও উৎপাদন শক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে। যা মানুষের জীবন মানকে বহুগুণ বাড়িয়ে এক উন্নত মানবিক সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্র তৈরী করেছে।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতার যুগের পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে অবস্থান করে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে। উন্নত দেশ সমূহ ও তাদের বহুজাতিক কোম্পানীগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির উদ্ভাবনগুলোকে কুক্ষিগত করে সেগুলোর সুফলথেকে বিশ্বের শত শত কোটি দরিদ্র মানুষকে বঞ্চিত করছে। সেগুলো তাদের মুনাফার লোভ ও লাভের উপায় হিসাবে ব্যবহার করে অনুন্নত দেশের জনগণকে শোষণ করছে।

বিশ্বায়নকে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে
সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনপদের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল তা আজ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা এবং তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ স্থান ও সময়ের দুরত্বকে পরাজিত করে সমগ্র বিশ্বকে একটি অখন্ড বিশ্বপল্লীতে পরিণত হবার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এ ভৌগলিক বিশ্বায়ন বিশ্বের সকল অঞ্চল ও দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, আদান-প্রদান সহযোগিতার সুযোগ সহজ করে মানব সভ্যতাকে এড়িয়ে নেবার বিশাল সম্ভাবনা তৈরী করেছে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার সুযোগ উন্নত দেশগুলো ভৌগলিক বিশ্বায়নকে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। উন্নত দেশগুলো তাদের বহুজাতিক কোম্পানী সমূহের পণ্য ও পুঁজির বিশ্বব্যাপী অবাধ যাতায়াতকে নিরাপদ করতে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাণিজ্য উদারীকরণ, নয়া উদারবাদ ইত্যাদি নানা নামে পুরো বিশ্বের উপর তাদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। অসম ও অন্যায্য বাণিজ্য ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে অনুন্নত দেশের বাজর দখল করছে। অনুন্নত দেশের জাতীয় শিল্প, জাতীয় কৃষি, জাতীয় অর্থনীতির পায়ের তলায় যতটুকু মাটি ছিল তা কেড়ে নিচ্ছে। গ্যাটসহ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অগণতান্ত্রিক ভারসাম্যহীন ব্যবস্থা ও নীতিকে ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলো বিশ্বের উপর একচেটিয়া অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনের প্রক্রিয়া উন্নত দেশের অর্থনীতির জন্য কাঁচামাল হিসাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ও সস্তা শ্রমের যোগানদারে পরিণত করা হচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানীর মুনাফার লোভ ও লাভের যুপকাষ্টে অনুন্নত দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বলি দেয়া হচ্ছে। উন্নত দেশ সমূহের চাপিয়ে দেয়া অসম ও অন্যায্য ব্যবস্থাভিত্তিক নতুন অর্থনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা অনুন্নত দেশকে পুনপনিবেশিক শৃংখলে অবাদ্ধ করে ফেলছে। এ পুনউপনিবেশকরণ প্রক্রিয়া সমতা, ন্যায্যতা, সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্বায়নকে বিশ্বের সকল মানুষের সুফলে লাগানোর সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

এক কেন্দ্রীক বিশ্বব্যবস্থা ঃ বিশ্বের উপর একাধিপত্যবাদ
অনুন্নত দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে পুনঃউপনিবেশকরণের শৃংখলে বেঁধে ফেলার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা উন্নত দেশগুলো সমগ্র পৃথিবীর উপর তাদের একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে যে ভারসাম্য বিরাজ করছিল, তা এখন নেই। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের শক্তিশালী অবস্থান পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও আদর্শিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে ছিল। শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে যে ভারসাম্য তৈরী করেছিল তা সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত উপনিবেশগুলোতে জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এড়িয়ে নেয়া এবং সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতে পছন্দমত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরী করেছিল। কিন্তু ৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের রাজনৈতিক বিপর্যয় ও পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী দেশগুলোকে সমগ্র বিশ্বের উপর বাধাহীনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। তারা এক বিশ্বব্যবস্থা নামে তাদের নিয়ন্ত্রিত এক কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা সমগ্র বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেয়।

প্রতিপক্ষ হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের হুমকি ও বৈরিতার অবসান হওয়ার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের নীতি ও সামরিক বল প্রয়োগের নীতি অব্যাহত রাখে। বিশ্বের কোন অঞ্চলে কোন দেশ মার্কিনের স্বার্থ ও ইচ্ছার বাইরে স্বাধীনভাবে নিজস্ব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পথ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সেই দেশকে শত্র“ ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে নির্লজ্জভাবে বল প্রয়োগ করছে বা বল প্রয়োগের হুমকি দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী একাধিপত্য প্রতিষ্ঠায় উন্মত্ত হয়ে আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্ব জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে একতরফাভাবে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বল প্রয়োগ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানা চাপ ও ব্ল্যাকমেইলিং এর মাধ্যমে জাতিসংঘকে অকার্যকর করে তাদের ইচ্ছা পূরণের ক্রীড়াকে পরিণত করতে চাইছে। এই মার্কিনী একতরফাবাদ, একাধিপত্যবাদ, সমরবাদ বিশ্বের সকল জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসাবে দেখা দিয়েছে।

বিশ্বের দেশে দেশে গণআন্দোলন জোরদার হচ্ছে
বহুজাতিক কোম্পানীর স্বার্থে চাপিয়ে দেয়া তথাকথিত মুক্তবাজর অর্থনীতি, বাণিজ্য উদারীকরণ, মুক্ত বাণিজ্য, মুক্ত অর্থনীতি, নয়া উদার অর্থনীতি, নয়া উদারবাদ বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের সংগ্রাম ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র রাজনীতি, সমাজ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্জিত মানবিক সাফল্যগুলোকে নির্মমভাবে ধ্বংস করছে। মানুষের মানবিক অস্তিত্ব, মানবিক মর্যাদা, মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা পরিবেশ সব কিছুই বহুজাতিক কোম্পানীর মুনাফার লোভ ও লাভের যুপকাষ্টে বলি দেয়া হচ্ছে। মানুষের অস্তিত্ব ও ভাগ্য বাজারের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। মানুষের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের চিরন্তণ দায়িত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে। অথচ সমাজ দর্শণ বিহীন এ বাজারব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, বেকারত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের দেশে দেশে এ বাজার দৈত্য এ বাজার মৌলবাদ এর কাছে অসহায়ভাবে মার খাওয়ার বদলে মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বাজার দৈত্যের উপর সমাজ ও রাষ্ট্রের বাজার খবরদারী-নজরদারী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, নারী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন, নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন দেশে দেশে দানা বাধছে এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতেও এ আন্দোলন ক্রমশঃ জোরদার হচ্ছে।

অসম ও অন্যায্য বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিশ্বের উপর দাঁড়িয়ে এককেন্দ্রীক বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সকল জাতি ও রাষ্ট্রের সমমর্যাদা ও অধিকারের ভিত্তিতে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে একটি সমতা, সহযোগিতা, শান্তি, উন্নয়নের বিকল্প বিশ্বায়নের দাবি জোরদার হচ্ছে। এককেন্দ্রীক বিশ্বব্যবস্থা এবং অসম ও অন্যায্য বাণিজ্যের অভিখাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে বহু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আঞ্চলিক উপআঞ্চলিক সহযোগিতা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সমূহের উপর উন্নত দেশগুলোর একক নিয়ন্ত্রণভিত্তিক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সকলের সমমর্যাদার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পূনর্গঠনের দাবি উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়া ঃ পুরাতন বিরোধে ক্ষত বিক্ষত
অসম ও অন্যায্য বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া, এক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতি ও রাষ্ট্র সমূহ অতীতের সকল বিরোধের অবসান ঘটিয়ে দ্বি-পাক্ষিক, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করছে তখন ভৌগলিক-নৃতাত্তিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যের নৈকট্য থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এখনো পুরাতন বিরোধ জিইয়ে রেখে পরস্পর দ্বন্দ-সংঘাতে লিপ্ত। এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো আভ্যন্তরীণভাবেও গণতান্ত্রের সংকট, সাম্প্রদায়িকতার সংকট, জাতিগত বিরোধের সংকটে ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে। এই আভ্যন্তরীন সংকট দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিফলন ঘটেছে। রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে স্থায়ী অবিশ্বাস ও বিরোধ সামরিক শক্তিমত্তা অর্জনের আত্মঘাতি পথে ঠেলে দিয়েছে। নিজ দেশের কোটি কোটি মানুষকে অভুক্ত রেখে ভারত-পাকিস্তান পারমানবিক বোমা তৈরী করছে। জাতিগত বিরোধ দমনের জন্য শ্রীলংকা বছরের পর বছর সামরিক খাতে ব্যায় বাড়িয়ে চলেছে। আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক ও জাতিগত বিরোধী দমনের জন্য নেপালও সামরিক খাতে ব্যঙ বাড়াতে শুরু করেছে। বাংলাদেশও কোন নীতি ও পরিকল্পনা ছাড়া লক্ষ্যহীণভাবে সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। সামরিক শক্তি নির্ভর পররাষ্ট্র নীতি দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ, বিরোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ অব্যাহত সমর সজ্জা শুধু আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, কোটি কোটি নরন্ন মানুষের প্রতি চরম উপহাসও বটে। আজ দক্ষিণ এশিয়া পারমানবিক বোমা, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিরোধের বোমা, দারিদ্র্য বোমার উপর দাড়িয়ে আছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক কোন কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা রাখতে পারছে না। কোটি কোটি জনগণের দক্ষিণ এশিয়া এ বিশাল বাজার দখলের জন্য পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর বহুজাতিক কোম্পানীগুলো দৃষ্টি দিয়ে আছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার বাজার বহুজাতিক কোম্পানীর পুরো দখলে চলে যাবে। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার জন্য রাষ্ট্র সমূহের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও বাণিজ্য ঘাটতি সহ দ্বি-পাক্ষিক সমস্যার দ্রুত সমাধান, সমর সজ্জা ও প্রতিযোগিতা বন্ধ, সামরিক শক্তি নির্ভর পররাষ্ট্র নীতি পরিহার, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ নয় চুক্তি করে দক্ষিণ এশিয়াকে শান্তির এলাকা ঘোষণা করা জরুরী। যৌথ আঞ্চলিক নিরাপত্তার ধারণার সূত্রপাত করা প্রয়োজন। দ্বিপাক্ষিক অমীমাংসিত সমস্যা সমূহ সমাধানে আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি চিহ্নিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার সূত্রপাত করা প্রয়োজন। বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারনার অর্ধনেই মেঘনা-ব্র˛পুত্র নদী অববাহিকা অঞ্চলে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল যৌথ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সুন্দরবন, হিমালয় সহ প্রাকৃতকি পরিবেশের যৌথ ব্যবস্থাপনা, অস্ত্র, মাদক-সৈন্য চলাচল বিহীন বহুপাক্ষিক স্থল ও নৌ পরিবহন চালু করা।

জাতীয় পরিস্থিতি
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন শোষণের অবসান ও স্বাধীণতা বাংলাদেশের সামনে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমৃদ্ধ উন্নত রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ব্রিটিশ-পাকিস্তানী আমলের উপনিবেশিক গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-প্রশাসন-আইন-কানুন এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন করা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উপনিবেশিক রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় স্বাধীন দেশের ক্ষতাসীনরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, গোষ্ঠী, দলীয় স্বার্থ রক্ষায় বিপর্যস্ত উপনিবেশিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে আবারও জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। ফলে দেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার বদলে স্বৈরতন্ত্রের পথে অগ্রসর হয়। নির্বাচিত সরকার, জনপ্রিয় সরকারও স্বৈরাচারি সরকারে পরিণত হয়। শাসক গোষ্ঠী স্বৈরাচারী শাসন দিয়েই বিকাশ শক্তিহীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। শাসক গোষ্ঠীর স্বৈরাচার এ বিকাশ শক্তিহীন পুঁজিবাদের দেহে নতুন গতি ও প্রাণ সঞ্চার করতে ব্যর্থ হয়। বরং স্বৈরাচারী শাসকদের লুণ্ঠন, দুর্নীতি পুঁজিবাদকে বিকৃতির দিকে ঠেলে দেয়। এই বিকাশ শক্তিহীন বিকৃত পুঁজিবাদ ও উপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রশাসন স্বৈরাচার, লুন্ঠন, শোষণ, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বেকারত্ব পশ্চাদপদতা ছাড়া কিছুই উপহার দিতে পারে নাই। বরং স্বাধীন দেশের উপযোগী রাষ্ট্র প্রশাসন সমাজ অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যর্থতার সুযোগে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত জাতি বিরোধী, গণতন্ত্র বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চার করেছে। দলীয় স্বৈরাচারী দুঃশাসনের চাইতে জঘন্য সামরিক স্বৈরাচারের উদ্ভব হয়েছে। সামরিক স্বৈরাচারী শাসকরা ইতিহাসের চাকা পিছনে ঘোরানোর অপপ্রয়াস পেয়েছে। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী ধারায় ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দিকনির্দেশনা নির্বাসিত করেছে। জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য বিকৃত করা হয়েছে। কবর থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের পচাগলা লাশ তুলে এনে রাষ্ট্র রাজনীতি সমাজ অঙ্গনকে বিষাক্ত করা হয়েছে। সামরিক শাসকরা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন সহ সকল জাতীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ জনগণ ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে এ সকল জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে।

সামরিক শাসন বিরোধী দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে আবার সাংবিধানিক শাসনের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৯০ এর গণঅভ্যূত্থান সাংবিধানিক ধারায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা তৈরী করে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য ৯০ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পর পর নির্বাচিত সরকার সমূহ দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নির্বাচিত সরকার সমূহ ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী, দলীয় স্বার্থরক্ষায় পুরানো উপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রশাসন আইন কানুন আঁকড়ে ধরে থাকা এবং বিকাশহীন বিকৃত পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখার শাসন নির্বাচিত সরকারের শাসনকে দুঃশাসনে পরিণত করে। নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতা দলবাজী, দখলবাজী, লুন্ঠন, সন্ত্রাসের পথে ধাবিত হয়। এ নীতিহীন ক্ষমতাবাজীর রাজনীতির পথ ধরে সুসংগঠিত সন্ত্রাস, লুটতন্ত্র, পরিবারতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। এই নীতিহীন ক্ষমতাবাজী রাজনীতির দুবৃত্তায়ন ঘটিয়েছে।

নীতিহীন ক্ষমতাবাজীর রাজনীতি, আপোষের রাজনীতি হাত ধরে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির উত্থান ঘটেছে। এ স্বাধীনতা বিরোধী জাতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকার ও রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রকাশে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

উপনিবেশিক রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন, কানুন, শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতাবাজী-দখলবাজী-লুট, সন্ত্রাস নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সুসংগঠিত সন্ত্রাসের উত্থান, পরিবারতন্ত্র, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য স্থায়ী সংকট ও বিপদ হিসাবে দেখা দিয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি
বাংলাদেশে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। দীর্ঘ উপনিবেশিক শোষনের কালে বাংলাদেশের পুঁজিবাদ বিকাশের শক্তি হারিয়ে পশ্চাদপদতার গন্ডিতে বন্দী। স্বাধীন দেশেও পুঁজিবাদ কোন গতি অর্জন করতে পারেনি, বরং শাসক গোষ্ঠীর লুটপাট পুঁজিবাদকে বিকৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থনীতিকে উৎপাদনশীল ধারায় গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুৎপাদনশীল ব্যবসায়িক পুঁজিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। ব্যবসায়িক পুঁজির দাপটে সকল উৎপাদন উদ্যোগ মার খেয়েছে। শিল্প গড়ে তোলার কোন শর্ত ও পরিবেশ তৈরী করা হয়নি। বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও উদ্যোগ বৈরি পরিবেশ তৈরী করে রাখা হয়েছে। উত্তরাধিকার সুত্রে যে শিল্প, অর্থলগ্নী, সেবামূলক খাত রাষ্ট্রের মালিকানায় ছিল তা অব্যবস্থাপনা, লুট, দুর্নীতির কবলে লোকসানী প্রতিষ্ঠানের পরিণত হয়েছে। সঠিক নীতি, ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে এ সকল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে জাতীয় শিল্প ও অর্থনীতির ভীত আরও সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এর চাপেও ঢালাও বিরাষ্ট্রীকরণের মাধ্যমে শিল্পের ভিত্তি ধ্বংস করা হচ্ছে। চরম বৈরি ও প্রতিকূল পরিবেশে ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ততটুকুও মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাণিজ্য উদারীকরণের ফাঁদে অনিশ্চয়তা ও হুমকির মধ্যে পতিত হয়েছে। অন্যায্য ও অসম বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্প মার খাচ্ছে।

দেশের বৃহত্তর অর্থনীতির বৃহত্তম খাত কৃষি। এ খাত সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত। বাণিজ্যিকভিত্তিতে উৎপাদন ও আধুনিক কৃৎ-কৌশলের ব্যবহারে কৃষি উৎপাদন দ্বিগুন বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এর চাপে এখাত থেকে রাষ্ট্রের সহায়তামূলক ভূমিকা প্রত্যাহার করা হয়েছে। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার অনিশ্চয়তা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উৎপাদন উপকরন না পাওয়া কৃষকরা তাদের উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে পারছে না। কৃষি পণ্যের বাজার ও বিপনন ব্যবস্থা এবং কৃষি নির্ভর শিল্পের অনুপস্থিতি কৃষি উৎপাদনে হতোদ্যাম পরিস্থিতি তৈরী করে রেখেছে।

বিদেশ নির্ভরশীলতার পরিমাণ কিছুটা কমে আসলেও স্বাধীনতার পর থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ জাতির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। ঋণ সাহায্য হিসাবে পাওয়া ১লক্ষ ৭০হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতার আনুকুল্যে সামরিক বেসামরিক আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ী, দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্টরা এ বিপুল পরিমান টাকা লুটেছে। রাজনীতিকদের মধ্যে যারা এ লুটের যৎসামান্য ভাগ পেয়েছে তারা সরকার পরিবর্তনের পর দুর্নীতির মামলায় পড়লেও বাকীরা ধরা ছোয়ার বাইরে থেকেছে। এ লুটেরা আমলারা প্রমোশন পেয়ে আরও বড় দাও মারে। লুটেরা লুটের টাকায় প্রাইভেট ব্যাংক বানায়। সরকারি ব্যাংকের শেয়ার কিনে পরিচালক হয়। টাকার জোরে ও রাষ্ট্র ক্ষমতার আনুকূল্যে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে শিল্প গড়ান নামে শত শত কোটি টাকা ঋণ দিয়ে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং শিল্প না গড়ে লোপাট করে। নিজেদের মালিকানাধীন ব্যাংক থেকেও একই কায়দায় শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এই লুটেরা-কালোটাকার মালিক মাফিয়াদের হাতে অর্থনীতি জিম্মি। এরা টাকা দিয়ে বড় দলের নির্বাচনী টিকেট কিনে এমপি-মন্ত্রী হয়, রাজনৈতিক দল-সংসদ-সরকার প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করে। এই লুটেরা মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে ফেলেছে সরকার ও রাজনৈতিক দল। অথচ মাত্র পাঁচ শত টাকা কৃষি ঋণ আদায়ের জন্য কৃষককে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নেয়া হয়। টিনের চাল-হাল-বদল ক্রোক করা হয়। কিন্তু লুটেরা কালো টাকার মালিকদের কাছে অনাদায়ী ১৩ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয় না।

লুটপাট ও দুর্নীতি নির্ভর অর্থনীতিতে জনগণ শুধু কর-খাজনা দেয় আর বিনিময়ে রাষ্ট্র থেকে পায় উপেক্ষা ও অত্যাচার। লুটপাটের আবর্তে বন্দী অর্থনীতি কোনভাবেই জাতীয় বিকাশ, সামাজিক চাহিদা ও মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারছে না। সামাজিক উৎপাদন বিকাশের স্বাভাবিক উর্ধমূখী অকাঙ্খাকে বাধাগ্রস্থ করে রেখেছে। ফলে দেশের ৭ কোটি মানুষ এখনও চরম দারিদ্র্য সীমার নীচে অবস্থান করছে। ৮ কোটি মানুষ নিরক্ষর। ৯ কোটি মানুষ প্রাথমিক। ৩ কোটি যুবক কর্মহীন বেকার।

অথচ উপযুক্ত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অতি সহজেই জাতীয় উন্নয়ন ও জনগণের উন্নত জীবনমান অর্জন সম্ভব। বিপুল প্রাকৃতকি সম্পদ, উর্বর সমতল ভূমি, পানি ও সেচযোগ্য মিঠা পানির অফূরন্ত উৎস, শ্রম শক্তির বিশাল ভান্ডার, অগণিত সৃজনশীল ও উদ্যমী মানুষ, দেশপ্রেম ও সংগ্রামী চেতনা সম্পন্ন বিশাল এক সমরূপ জনগোষ্ঠী, অনুকুল প্রাকৃতিক পরিবেশ-যা পৃথিবীর বুকে দুর্লভ। শুধু তাই নয়, সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা প্রতিনিয়ত পরিচিত হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সর্বশেষ উৎকর্ষতার সাথে। বাঙালিদের এ অর্জন বাঙালির একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের উন্নয়নে নিয়োজিত হলে জাতীয় বিকাশ বহুগুণ ও মাত্রায় গতি অর্জন করবে।

সমাজ ও সংস্কৃতি
সংকীর্ণ ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দলীয় স্বার্থের রাজনীতি, গণবিরোধী রাষ্ট্র-প্রশাসন আইন-কানুনের দাপটে এবং অর্থনীতিতে লুটেরা অবৈধ টাকার মালিক মাফিয়া চক্রের দাপট আজ সমাজে তৈরি করেছে চরম হতাশা। পঞ্চাশ ভাগ মানুষ চরম দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে। ষাট ভাগ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আশি ভাগ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ বঞ্চিত। তিন কোটি মানুষ বেকার। কোথাও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে না। হতাশাগ্রস্থতার ফলে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সামাজিক অনাচার ও অন্যায় প্রবণতা। ‘যেভাবে পারো টাকার মালিক হও’ ধারণা ধ্বংস করে দিচ্ছে সকল মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। সমগ্র সমাজ গ্রাস করে ফেলেছে সম্ভোগ ও নৃশংসতার সংস্কৃতি। সামাজিক-পারিবারিক সংহতি ভেঙ্গে পড়ছে। সমষ্টিগত সামাজিক ও পারিবারিক চেতনাকে পরাস্ত করছে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থপরতা। সমাজ জীবনের হতাশার পথ বেয়েই ধর্মীয় মৌলবাদ-ধর্মান্ধতা-কুসংস্কার-পশ্চাৎপদ ধ্যান ধারণার উত্থান ঘটছে। একদিকে নারীর প্রতি পরিবারে ও সমাজে সহিংসতা বাড়ছে, অন্যদিকে নানা রকম ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও ফতোয়ার মাধ্যমে নারীর জীবন ও অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। পশ্চাৎপদ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে জাতীয় চেতনা-ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা ভোগবাদী বিকৃত সংস্কৃতি তরুণ-যুব সমাজকে গ্রাস করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা
সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি এবং দেশে একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ থাকার পরও শিক্ষা ক্ষেত্রে চলছে চরম নৈরাজ্য বিশৃংখলা বৈষম্য। একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশে প্রচলিত আছে চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা: সাধারণ শিক্ষা, এনজিও পরিচালিত শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং বিত্তবানদের জন্য ক্যাডেট কলেজ কিন্ডার গার্টেন-বেসরকারী-বাণিজ্যিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের অনীহার কারণে সাধারণ শিক্ষা আজ সংকটে নিপতিত। এনজিও পরিচালিত শিক্ষায় পদ্ধতিগত উৎকর্ষতা থাকলেও তার সাথে সাধারণ শিক্ষার কোন সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে পাঠক্রমকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পায় পশ্চাদপদতা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণা। শিক্ষার বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের ধারা শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করেছে এবং শিক্ষাকে ধনিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া বিষয়ে পরিণত করেছে। দেশব্যাপী চলছে শিক্ষা ব্যবস্থা নামের বহুল মুনাফার নতুন ব্যবসা। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানো যে ঐ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ধনিক গোষ্টির সন্তানরা মানবিক-সামাজিক-জাতীয় চেতনাহীনভাবে গড়ে ওঠেছে এবং তারা পরবর্তীতে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করছে। অথচ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকরা কর্মসংস্থানের সাধারণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা জাতীয় বিকাশকে রুদ্ধ করে এবং জাতির পতনের সূচনা করে। জাতীয় বিকাশের জন্য শিক্ষত জনগোষ্ঠীর বিকল্প নেই। এমনকি ভাতের ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে যদি সর্বোগ্রে শিক্ষার সুব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়। আজ তাই জাতিকে সর্বাগ্রে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যত কষ্টই হোক জাতিকে শিক্ষত করে তোলার জন্য একই পদ্ধতির সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসী জনগণ
দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই এ ভুখন্ডের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতি রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য শুরু হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষা যুক্ত হবার পর সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলেও রাজনৈতিক বৈষম্য কমে এসেছিল। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা নির্বাসন ও পরবর্তীতে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করার ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রাজনৈতিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। পাকিস্তান আমলে প্রণীত শত্র“ সম্পত্তি আইন স্বাধীন দেশের অর্পিত সম্পত্তি আইন হিসাবে বহাল থাকায় সংখ্যালঘু জনগণ তাদের সম্পত্তি নানাভাবে হারাতে থাকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে বাঙালি ছাড়াও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার যে অবস্থান ও বসবাস রয়েছে, সংবিধানে তার স্বীকৃতি নেই। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতির অভাব এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা অধ্যূষিত অঞ্চলে বাঙালি বসতি সম্প্রসারণ ও তাদের জমি দখল ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সমূহকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রামের পথ গ্রহণ করে। ফলে দীর্ঘ দুই যুগ পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে। ১৯৯২ সালে তৎকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে পার্বত্য শান্তি চুক্তি করে। এ চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অনেক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অধিকার মেনে নেয়া হলেও সাংবিধানিকভাবে পৃথক জাতিসত্তা হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। আজও সে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নানা তালবাহানা চলছে।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো, হাজং, রাজশাহী বিভাগের সাঁওতাল এবং সিলেটের খাসিয়া মনিপুরি সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও আদিবাসী জনগণ রাষ্ট্রীয়-সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে ক্রমান্বয়ে নিজ এলাকা ছাড়া হয়ে অস্তিত্ব বিলোপের পথে চলছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ
বাংলাদেশ ভূপ্রাকৃতিকভাবে দক্ষিণ হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত। হিমালয় পর্বতমালা থেকে সৃষ্ট অসংখ্য নদ-নদী এবং এদের শাখা প্রশাখাসমূহ নেপাল ভারত হয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত। এ সকল নদ-নদী এবং নদীবাহিত পলি বিধৌত বিশ্বের বৃহত্তর ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভূমি ও প্রকৃতি-পরিবেশ মানুষের জীবন যাপনকে সহজতর করেছে। এসকল নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষি ও সভ্যতা।
এ সকল নদ-নদী ও পানি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে শুধু পরিবেশ ও প্রকৃত রক্ষাই হত না, পানি সম্পদ ব্যবহার করে উন্নয়নের বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত করা যেত। কিন্তু এ অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহে নেতিবাচক রাজনীতির প্রাধান্য থাকায় এ অঞ্চলের পানি সম্পদ ব্যবহারে কোন যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া যায়নি। জাতীয়ভাবেও পানি সম্পদ ব্যবহার ও প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে নদী নির্ভর প্রকৃতি-পরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। উত্তর পূর্ব হিমালয় অঞ্চলে পানি সম্পদ ব্যবহারে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাবে নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদীসমূহের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এ অঞ্চলের সুন্দরবন সহ সংশ্লিষ্ট অংঞ্চলের পরিবেশ-প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে। নদ-নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ না থাকায় নদীবক্ষ ভরাট, চর জাগা ও মোহনায় প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে একদিকে খরা অন্যদিকে প্রলম্বিত বন্যা দেখা দিচ্ছে।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথেচ্ছ ও অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জলজ প্রাণি সহ প্রাণবৈচিত্র ধ্বংসের পথে। অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট-পুল-কালভার্ট-স্লুইস গেইট নির্মাণ কোথাও নদ-নদীর স্বাভাবিব প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে, কোথাও নদী-নালা শুকিয়ে দিচ্ছে, কোথাও ভাঙন দেখা দিচ্ছে আর কোথাও তৈরি করছে জলাবদ্ধতা। বনভূমি উজাড় হবার ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশই কেবল বিপন্ন হচ্ছে না, একই সাথে বিপন্ন হচ্ছে গারো-হাজং-সাঁওতাল সহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অস্তিত্ব।

বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে পানি সম্পদ ব্যবহারের কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ প্রাকৃতিক-পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উত্তর পূর্ব হিমালয় অঞ্চলে যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।

রাজনৈতিক শক্তি সমূহের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
দীর্ঘ বিদেশী শাসন ও স্বাধীন দেশেও পরাধীন আমলের নেতিবাচক রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার প্রাধান্য, গণবিরোধী রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থা বহাল ও অর্থনীতিতে লুটপাটের ধারা অব্যাহত থাকার ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক ধারায় বিকশিত হতে পারেনি। অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা ও সমাজে শ্রেনীকেন্দ্রীক গতিশীলতার অভাবে রাজনৈতিক শক্তিসমূহ শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। কি ডান কি বাম, কোন ধারার রাজনৈতিক শক্তিই নিজস্ব দৃঢ় সামাজিক ভিত্তি অর্জন করতে পারেনি। ফলে জাতীয়তাবাদী শক্তি জাতীয় ঐক্য-জাতীয় চেতনা-জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আপোষহীন দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে পারে না। ভুলে যায় জাতীয় চেতনা। জাতীয় পরিচয় নিয়ে পড়ে বিভ্রান্তিতে। জাতীয় আকঙ্খা ধারন করতে পারে না। জাতীয় বিকাশের পথ নির্দেশ করতে পারে না। জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বিদেশী প্রভাবের কাছে নতি স্বীখার করে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শীক্ত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে দাঁড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের শত্র“দের সাথে আপোস করে। গণতান্ত্রিক শক্তি গণতন্ত্র রক্ষায় আপোসহীন ভূমিকা পালন করে না, গণতন্ত্র বিরোধী শীক্ত স্বৈরাচারের সাথে আপোস করে। সমাজতান্ত্রিক বাম শক্তি শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম ছেড়ে ঐক্যের নামে বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করে। ধর্ম নির্ভর রাজনৈতিক শক্তিগুলো ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণের অধিকার, জনগণের সংগ্রাম, উন্নয়ন-অগ্রগতি-যুক্তি-বুদ্ধি-মানবতা-সভ্যতা প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এ শক্তিগুলো ধর্মের দোহাই দিয়েই বাঙিালির স্বাধীনতার বিরোধীতা করে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা নারী ধর্ষণে অংশ নিয়েছিল।

রাজনৈতিক শক্তিসমূহের এ ঐতিহাসিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার ফলে দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহীতা, জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় ক্ষতি, জাতীয় চেতনা ও জাতি বিরোধী চেতনা, গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য ও সীমারেখা মুছে যায়। কোন রাজনৈতিক দল ও নেতা নেত্রীরা নিজ দলে গণতন্ত্রের চর্চা করেন না। কোর রাজনৈতিক শক্তিই জনগণের আকাঙ্খা ও আস্থা ধারণ করে ধারাবাহিকভাবে জনগণের সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারে না।

নতুন সামাজিক শক্তির উত্থান
বছরের পর বছর দুঃশাসনের পরও বাংলাদেশের চাকা যারা সচল রেখেচেন, তারা হলেন দেশের ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ। গ্রামের ক্ষুদ্র চাষীরা দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়েছে দ্বিগুনেরও বেশী। প্রবাসী বাঙালিরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশে ব্যাপক পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছে। ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে না এমন উদ্যোক্তারাই গড়ে তুলেছে বিরাট পোশাক-বস্ত্র-ঔষধ নির্মাণ-তথ্যপ্রযুক্তির খাত। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে না এমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোয় বিশাল অবদান রেখেছে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা ১ কোটি পরিবার, যাদের অধিকাংশই নারী, গ্রামীন অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। পোশাক শিল্পের ১৫ লক্ষ নারী শ্রমিক সহ গ্রাম শহরের অর্থনীতি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডাক্তার, প্রকৌশলী কৃষিবিদ অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সহ মেধাসম্পন্ন এক বিরাট বেসরকারী উন্নয়ণ সংস্থা ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান ছাড়াও মানবাধিকার ও নারীর ক্ষতায়নের জন্য সামাজিক সচেকনতা বৃদ্ধির প্রয়াসের মাধ্যমে সামাজিক গতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এ সকল সংষ্থায় কর্মরত অসংখ্যা শিক্ষিত তরণ-তরুণী উন্নয়নের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করছে। এই নতুন সমাজশক্তি বাংলাদেশের চাকা সচল রাখলেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন। এদের কোন রাজনৈতিক মুখপত্র নেই, প্রতিনিধিত্বও নেই, এমন কি নিজেদের সংগঠিত হবার অধিকারও নেই।

জাসদ কি চায়
স্বাধীনতার ৩১ বছর পর এটা প্রমাণ হয়েছে বিদ্যমান উপনিবেশিক রাষ্ট্র-প্রশান-আইন-কানুন ও ঐতিহাসিকভাবে বিকাশশক্তিহীন ও বিতৃতির গন্ডিতে আবদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক কোনভাবেই দেশকে এগিয়ে নিতে পারছে না। বরং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অগ্রগতি ও প্রগতির পথে তা শক্ত প্রতিবন্ধক হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নেই জাসদ এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংগ্রামের সূচনা করেছে। আজ এটা সকলের উপলব্ধি। দুএকটি ক্ষেত্রে আংশিক সংস্কার বা পরিবর্তন সহ উপর থেকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে কোন অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। জনগণ স্থায়ীভাবে দুঃশাসন, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন, অনুন্নয়ন, পশ্চাদপাতের শিকার হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় জনগণের আশা আকাংখা মতামতের কোন প্রতিফলন ঘটে না। বরং জনগণের আশা আকাংখা মতামত সামাজিক চাহিদাকে হত্যা করা হয়। বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ও শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণ তাদের শ্রম-দক্ষতা মেধা দিয়ে সামাজিক উৎপাদনের চাকা যতটুকু সচল রাখে তাকে বাঁধাগ্রস্থ করা হয়। সকল ধরনের সৃজনশীলতা, উৎপাদনশীলতা মার খায়।

জাসদ তাই বিদ্যমান গণবিরোধী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর আমুল পরিবর্তন চায়। জাসদ এমন রাজনৈতিক কাঠামো চায় যে কাঠামোর মধ্যে শ্রমজীবী-কর্মজীবী, পেশাজীবী-জনগণের, নারী সমাজের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব থাকবে, তাদের মতামত আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটবে। অর্থনীতিতে সকল উৎপাদন-বিনিয়োগের অনুকুল পরিবেশ তৈরী হবে। শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী মানুষ তাদের শ্রমশক্তি, দক্ষতা, মেধা সামাজিক উৎপাদনে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করার সুযোগ পাবে, বিনিময়ে সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের উন্নত মানবিক জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। তাই জাসদ বর্তমান যে রাজনৈতিক ও সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র কাঠামো পরিচালিত হচ্ছে তার পরিবর্তন চায়। জাসদ নতুন সামাজিক রাজনৈতিক চুক্তি চায়, যার বলে রাষ্ট্রের উপর শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী-নারীর অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। দেশ শাসন-আইন প্রণয়ন নীতি নির্ধারণ বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ থাকবে। জনগণের অংশীদারিত্বভিত্তিক নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। যে রাষ্ট্রের নিয়ন্তা হবে প্রকৃত অর্থেই জনগণ।

আন্দোলনই এগিয়ে যাবার পথ
শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী নারীল অংশীদারিত্ব ভিত্তিক নতুন উন্নত রাষ্ট্র আকাশ থেকে পড়বে না। এ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তনের পথে হিমালয়ের মত শক্ত বাধা হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান রাষ্ট্র-প্রশাসন ব্যবস্থা। শুধুমাত্র বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমালোচনা করে সুন্দর সুন্দর কথা বললে, বক্তৃতা-বিবৃতি দিলে এর পরিবর্তন হবে না। এজন্য প্রয়োজন শক্তি প্রয়োগ। জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি প্রয়োগ করে বর্তমান ব্যবস্থাকে অকার্যকর, বাতিল ও অপসারণ করতে হবে। জনগণের শক্তির বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে গণআন্দোলন। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী-নারীর এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে যা আগামী দিনের রাষ্ট্র কাঠামো ধারণ করবে। এ আন্দোলন এগিয়ে নিতে হলে প্রতি পদে পদে মোকাবেলা করতে হবে বর্তমান ব্যবস্থার ধারক শাসক গোষ্ঠীর দুঃশাসন-অত্যাচার-নির্যাতন, গণবিরোধী আমলাতন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা,কালো আইন, লুটেরা গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, সাম্প্রদায়িক শক্তি সহ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে। এ পথেই জনগণের আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে। জনগণের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-বেদনা-কষ্ট-অভাব-অনটন-সমস্যা আশা-আকাংখা অনুভূতি ধারন করে প্রতিনিয়ত ছোট ছোট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারী শক্তি ও জনগণের মধ্যে জল ও মাছের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। জনগণের যতটুকু অধিকার আছে, যতটুকু গণতন্ত্র আছে তার উপর শাসক গোষ্ঠীর হামলা, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংস্কৃতি, চেতনা, মূল্যবোধের উপর হামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠবে।

জাতীয় প্রশ্ন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে জাতীয় আন্দোলন থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নানা ধরনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের শক্তি গড়ে উঠবে। শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা ও বিকাশের সংগ্রামের পাশাপাশি জাতীয় প্রশ্নে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবে। তাদের নিজস্ব আন্দোলনের শক্তি গড়ে তুলবে। জাসদ সকল দেশপ্রেমিক, বিবেকবান সচেতন নাগরিককে এ আন্দোলনের ধারায় শামিল হবার আহ্বান জানাচ্ছে।

ঐক্যের আহ্বান
কোন একক নেতা, দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন আন্দোলনকারী শক্তির ঐক্য, জনগণের ঐক্য, জাতীয় ঐক্য। জাসদ সমাজ পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে সফল দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শীক্তর রাজনৈতিক ঐক্য এবং ঐক্য মোর্চা গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে। এই ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি গণআন্দোলন এবং গণআন্দোলনের ধারায় নির্বাচন মোকাবেলা, সরকার গঠন ও সরকার পরিচালনা সহ রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন মোকাবেলা করবে। জাসদ শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ঐক্য গড়ে তোলা এবং আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ সংস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।

জাসদের ঘোষণা
জাসদ প্রতিষ্ঠাকালীন ‘সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ ঘোষণার প্রতি অবিচল আস্থা জ্ঞাপন করছে।

জাসদ মানব মুক্তির সর্বোত্তম দিগদর্শন হিসেবে সাম্যবাদী বিশ্বদর্শণের ওপর অবিচল আস্থা জ্ঞাপন করছে।

জাসদ বিদ্যমান শ্রেণী বিভক্ত সমাজ শোষিত শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণ, নারী সহ সমাজের অনগ্রসর অংশ ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার রাজনৈতিক অধিকার-ক্ষমতা-কর্তৃত্ব ভিত্তিক অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আশু কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করছে।

জাসদ সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয় স্বার্থ বিরোধী যে কোন বিদেশী প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করবে।

জাসদ জাতীয় স্বার্থ, সামাজিক চাহিদা, মানব উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের শর্তে বাজার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার সংগ্রাম পরিচালনা করবে।

জাসদের আন্তর্জাতিক ঘোষণা
জাসদ পারমানবিক অস্ত্রমুক্ত নিরাপদ শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে একাত্ব।

জাসদ সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সকল জাতিরাষ্ট্রের স্বাধীন বিকাশের ন্যায্যতাকে সমর্থন করে।

জাসদ সকল জাতি ও রাষ্ট্রের সমমর্যাদা ও সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতেপারস্পরিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী।

জাসদ পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাষ্ট্রসমূহের চাপিয়ে দেয়া এক বিশ্বব্যবস্থা বা বিশ্বায়নের বিপরীতে সকল জাতি ও রাষ্ট্রের নিজ নিজ বিকাশের প্রয়োজনে সমমর্যাদা ও সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতে উপ-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বিকল্প বিশ্বায়নে বিশ্বাসী।

জাসদ পুঁজি ও পণ্যের অবাধ যাতায়াতের পাশাপাশি শ্রমশক্তির অবাধ যাতায়াতে বিশ্বাসী।

আশু কর্মসূচি
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছে। অব্যাহত এই সংগ্রামের ধারায় ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে বার বার, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাই ক্ষমতার হাত বদল হলেই যে সাধারণ মানুষের মঙ্গল হয় না এ সত্যটিএদেশের মানুষ অনুভব করতে ব্যর্থ হয়নি। শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী মানুষ আর বর্তমান শাসন ও সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নয়। একটি সার্বিক ও বিপ্লবী পরিবর্তন তাদের কাম্য। জনগণের আকাঙ্খা, চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতা বিবেচনা করে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসন ব্রবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণের সামনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল নিম্নলিখিত কর্মসূচি হাজির করছে এবং এই কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলা ও তা বাস্তবায়নের সংকল্প ঘোষণা করছে।

ক. রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও সংবিধান
১। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিীত্ততে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংহত ও সুদৃঢ় করা।
২। ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এসকল নীতি ও চেতনার পরিপন্থী সকল সংশোধনী বাতিল করা। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অপরিবর্তনীয় করতে সংবিধানে বিধান যুক্ত করা।
৩। মৌলিক অধিকার ও সার্বজনীন মানবাধিকার সাংবিধানিকভাবে অলঙ্ঘনীয় করা। মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার বিরোধী সকল বিধান ও আইন বাতিল করা।
৪। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা সমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করা।
৫। প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বস্তর শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী, নারী সহ সমাজের অনগ্রসর অংশ ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নির্বাচিত প্রতিনিধির অংশগ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা।
৬। রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা এবং এ লক্ষ্যে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করে বিশেষ বিধান তৈরি করা।
৭। দারিদ্র্য বিমোচন, বেকারত্ব দূরীকরণ, বৈষম্য দূরীকরণ, মানব উন্নয়ন, সামাজিক চাহিদা, পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়নের নীতির ভিত্তিতে পরিকল্পিত জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা।
৮। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন ও উর্ধ্বে রেখে প্রত্যেক জাতি ও রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব, মৈত্রী ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
৯। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ ছাড়া রাষ্ট্রীয় সকল তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ করা।
১০। প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার নিশ্চয়তা বিধানে রাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারণ করা।
১১। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করা। ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা।
১২। বেকারত্ব, ব্যধি, পঙ্গুত্ব, বৈধব্য, অনাথ অবস্থা, বার্ধক্য কিংবা অনুরূপ পরিস্থিতিতে নিপাতিত নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করা।
১৩। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সম অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা, বৈষম্যমূলক সকল বিধি-বিধান বাতিল করা এবং এরূপ কোন বৈষম্যমূলক আচরণ নির্মূল ও নিষিদ্ধ করা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা।
১৪। নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র-সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমঅধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করা। নারীর প্রতি পশ্চাদপদ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী নির্মূল করা। নারীর ক্ষমতায়নের ব্যবস্থা চালু করা।
১৫। স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে প্রতিটি শিশুর বিকাশ নিশ্চিত করা। শিশুর দাবিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা।
১৬। সমাজের পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর অংশকে পশ্চাদপদশা থেকে মুক্ত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করা।
১৭। দেশের সকল অংঞ্চল-এলাকায় সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং অনুন্নত ও পশ্চাদপদ অঞ্চল-এলাকার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার প্রদান করা।

খ. সংসদ-সরকার
১। সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী, বিকশিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া।
২। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করা। বর্তমান গঠন প্রণালী অক্ষুন্ন রেখে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী, নারী সহ সমাজের অনগ্রসর অংশ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা।
৩। উচ্চকক্ষ প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে সুপারিশ প্রেরণ করতে পারবে। এ সুপারিশ নিম্নকক্ষে আলোচিত হবার বিধান প্রণয়ন করা।
৪। সংসদের নিম্নকক্ষে নারী প্রতিনিধির বর্তমান বিধার পরিবর্তন করে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের বিধান চালু এবং নারীর আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
৫। সংসদের নিম্নকক্ষে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আনুপাতিক হারে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
৬। সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বচনের ক্ষেত্রে বর্তমান পদ্ধিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসমূহের প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করা।
৭। সরকার বা মন্ত্রী পরিষদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদীয় কমিটিসমূহ শক্তিশালী করা, মন্ত্রী ভিন্ন যে কোন সদস্যকে সংসদীয় কমিটির প্রধান করা, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম জনগণের সামনে উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য করা এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গণশুনানী চালু করা।
৮। মন্ত্রণালয় পরিচালনায় মন্ত্রীকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করার জন্য মন্ত্রী কর্তৃক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের বিধান প্রবর্তন করা।
৯। মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দ্বৈত-প্রশাসন বিলোপকরা। মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল অধিদপ্তর-পরিদপ্তর-সেক্টর-কর্পোরেশনকে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করা এবং সরাসরি মন্ত্রীর অধীনে ন্যস্ত করা।
১০। সংসদ সচিবালয় স্পীকারের অধীনে ন্যস্ত ও শক্তিশালী করা।
১১। জাতীয় ঐকমত্যের শাসন চালু করা।

গ.প্রশাসন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসন
১। কেন্দ্রীভূত আমলা প্রশাসনের বিলোপ করা। প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কর্তৃত্ব চালু করা।
২। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
৩। স্থানীয় সরকারকে সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা। বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত ছাড়া স্থানীয় সরকার পরিষদ বাতিল বা নির্বাচিত জন প্রতিনিধিকে বরখাস্ত না করার বিধান চালু করা। স্থানীয় সরকারের উপর আমলা কর্তৃত্বের অবসান, স্থানীয় সরকারের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা এমপিদের তদারকী বন্ধ করে স্বাধীন ও স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা।
৪। স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ সহ প্রশাসনকে স্থানীয় সরকারের অধীনে সম্পূর্ণ ন্যস্ত করা।
৫। স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, কর ধার্য ও আদায়ের সকল দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে প্রদান করা। জাতীয় রাজস্ব আয়ের ৪০ ভাগ স্থানীয় সরকারকে প্রদান করা। জাতীয় বাজেটের উন্নয়ন খাতের জেলা ও উপজেলা ওয়ারী আলাদাভাবে প্রকাশ করা। স্থানীয় সরকার কর্তৃত গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাংক কর্তৃক অর্থায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন করা।
৬। স্থানীয় সরকারের শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নির্বাচিত নারী প্রতিনিধির দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা।

ঘ. আইনের শাসন, বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
১। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।
২। সর্বস্তরে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধান এবং বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব সুপ্রীম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করতে সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩। হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগে সুপ্রীম কোর্টের সুপারিশ অলঙ্ঘনীয় করা।
৪। বিচার কাজে বিলম্ব দূর করার জন্য বিচার ব্যবস্থার জটিলতা দূর করা এবং পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ করা।
৫। ৪র্থ, ৫, ৭ম, ৮ম সংশোধনী, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ৫৪ ধারা ও অর্পিত সম্পত্তি আইন সহ মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার বিরোধী সকল কালো আইন বাতিল করা।
৬। ন্যায়পাল নিয়োগ করা।
৭। স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন করা।
৮। স্বাধীন দুর্নীতি কমিশন গঠন করা।
৯। স্বাধীন তদন্ত ও অনুসন্ধান কমিশন গঠন করা।
১০। একাউনটেন্ট জেনারেল ও কম্পট্রোলার জেনারেল অফিস পৃথক ও স্বাধীন করা।

ঙ. পুলিশ
১। পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণরূপে স্তরভিত্তিক স্থানীয় সরকার পরিষদ ও জাতীয় সংসদের অধীনে থাকবে। বিচার বিভাগের নির্দেশ পুলিশ বাহিনীকে মানতে বাধ্য করার উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীর জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রেরণা, অস্ত্র শস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
২। আইন-শৃংখলা ভঙ্গ ও সামাজিক অপরাধের জন্য গ্রেফতারকৃত কোন ব্যক্তিকে কোন হয়রানি বা দৈহিক নির্যাতন করা যাবে না। আইনের চোখে পুলিশের এই ধরনের কার্যকলাপ অন্যায় বলে বিবেচিত এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
৩। কোন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া আটক করতে পারবে না।
৪। পুলিশ বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য শক্তিশালী আনছার, ভিডিপি সহ কমিউনিটি পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা।
৫। বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এলাকার আইন-শৃংখলা রক্ষা, সন্ত্রাস নির্মূল ও ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশ গড়ে তোলা।

চ. কারাগার
কারাগারকে নিপীড়নমূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে না রেখে বন্দীদের জন্য সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ১৮৯৪ সালের প্রিজনস এ্যাক্ট বাতিল করে নতুন জেল কোড প্রবর্তন করা। িৈনতক শিক্ষা ও সৃষ্টিশীল শ্রমের মাধ্যমে অপরাধীদের সংশোধন করে সমাজে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে পুনর্বাসন করা। বন্দীদের স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, স্কুল, হাসপাতাল, কাজের ক্ষেত্র, চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা। বন্দীদের কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক প্রদানকরা। উপার্জনক্ষম কোন সদস্য না থাকলে কারা বন্দীর পরিবারের ভরন-পোষনের ভার রাষ্ট্র কর্তৃক গ্রহণ করা।

ছ. নির্বাচনী ব্যবস্থা ও আইন
১। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী তথা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের পদ্ধতিকে সাংবিধানিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের জন্য সংবিধানের ১১৮ ধারা সংশোধন করা।
২। ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধি আদেশ ও ১৯৯২ সালের জনপ্রতিনিধি আদেশ সহ নির্বাচন বিষয়ে ইতোমধ্যে যে সব আইন প্রণীত হয়েছে তার সবগুলোকে সমন্বিত ও যুগোপযোগী করা।
৩। প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদ, প্রযুক্তি ও লোকবলের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও কর্তৃত্বপূর্ণ সংস্থায় পরিণত করা। নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে নির্বাচনী ক্যাডার সার্ভিস গড়ে তোলা এবং এই ক্যাডার সার্ভিস থেকে রিটার্নি অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা।
৪। নির্বাচনী আচরণ বিধিকে আইনে পরিণত করা। নির্বাচনী আইন প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনকে বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা অর্পণ করা। নির্বাচন বিধি লংঘনের জন্য নির্বাচন বাতিল, আটক ও দন্ড প্রদানের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া।
৫। প্রবাসী, ভাসমান, বস্তিবাসী ও নিজ এলাকায় অনুপস্থিত নাগরিকদের ভোটার তালিকাভুক্ত করা।
৬। নির্বাচনী প্রচারে ধর্মের ব্যবহার, ধর্মী উপাসনালয়ে নির্বাচনী প্রচার, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রচার নিষিদ্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা।
৭। হাইকোর্টের কার্যরত বিচারপতি বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বের নির্বাচনী মামলার শুনানী গ্রহণ এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নির্বাচনী মামলার নিস্পত্তি করা।
৮। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রাপ্ত ভোটের একান্ন ভাগ ভোটার প্রতিনিধি প্রত্যাহারের প্রতিনিধিকে প্রত্যাহারের আইন করা। তবে একটি মেয়াদকে একবাররে অধিক প্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং নির্বাচনের এক বছরের মধ্যে প্রতিনিধি প্রত্যাহার না করা।
৯। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সুনির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলসমূহের রেজিষ্ট্রেশন করা এবং ঐ আইনের অধীনে রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত দলকে সহযোগিতা প্রদান করা।

জ. অবাধ তথ্য প্রবাহ ও গণমাধ্যম
১। তথ্যের অধিকার ও অবাধ তথ্য প্রবাহকে নাগরিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া।
২। জাতীয় স্বর্থে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-দর্শনের আত্মীকরণ ও মিথস্ক্রিয়ার জন্য সৃজনশীল ও মৌলিক বই-পত্রিকা-সিডি-ভিডিও-অডিও আমদানি, বিপনন ও বিতরণে সকল বাধা দূর করে উৎসাহ ও আনুকূল্য প্রদান করা। এ সমস্ত বিষয়ে নীতি নির্ধারণ ও কার্যপ্রণালী বিধি প্রণয়নে ছাত্র-শিক্ষক-গকেষক-বিজ্ঞানী-ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা।
৩। ইন্টারনেট, ই-মেইল সহজলভ্য করা।
৪। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৫। বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
৬। গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য পিআইবি-র বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগিতা ও আনুকূল্য প্রদান করা।
৭। সৃজনশীল ও মৌলিক গ্রন্থ-প্রবন্ধ অনুবাদ ও প্রচারে বাংলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় যাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক মঞ্জুরি দেয়া।

ঝ. অর্থনীতি ও উন্নয়ন
১। জাতীয় আকাংখাবে ধারণ করে সুনিদির্ষ্টি জাতীয় বিকাশের ধারা রচনা করতে বিদেশ নির্ভরশীল অনুৎপাদনশীলতা ও লুটপাটের আবর্তে বন্দী অর্থনীতিকে মুক্ত করে দারিদ্র বিমোচন, বেকারত্ব দূরীকরণ, বৈষম্য দূরীকরণ, মানব উন্নয়ন, সামাজিক চাহিদা, পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়নের নীতির ভিত্তিতে পরিকল্পিত জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন।
২। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের বদলে জাতীয় বাজার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন।
৩। বাজার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় খাত, মিশ্রখাত, সমবায় খাত ও ব্যক্তি খাতকে উৎপাদনশীল-সৃজনশীল ধারায় বিকাশের ব্যবস্থা করা।
৪। আমদানি-বিকল্প শিল্প বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করা।
৫। রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা।
৬। বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য গ্রহণে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ বিবেচনা প্রদান করা এবং গৃহীত ঋণ ও সাহায্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা।
৭। জাতীয় অংশীদারিত্বের শর্তে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বে পুঁজি প্রত্যাহার না করার শর্তে মৌলিক শিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা।

ঞ. কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও ভূমি সংষ্কার
১। পরিবার পিছু জমির সিিলং অনধিক এক ফসল জমির জন্য ৫০ বিঘা (১৬.৬৬ একর) এবং দুই ফসলি জমির জন্য ৩০ বিঘা (১০ একর) নির্ধারণ করতে হবে।
২। দেবোত্তর ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি দেশের সাধারণ সরকার কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বোর্ড, স্থানীয় সরকার ও কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থার দায়িত্বে অর্পণ করা। এসব জমি থেকে যে আয় যে প্রতিষ্ঠানের পাওয়ার কথা সেই প্রতিষ্ঠানকে সেই আয় প্রদান করা।
৩। শহরের সম্পদ ও সম্পত্তির সর্বোচ্চ সিলিং বেধে দেয়া। শহরের আবাসিক জমির জন্য পরিবার পিছু সাড়ে সাত কাঠা (০.১২৪ একর) সিলিং নির্ধারণ করা।
৪। সমুদ্র ও নদীর যে কোন ধরনের চর জমি জেগে উঠার সাথে সাথে জমি হিসেবে বিবেচনা করা।
৫। অনাবাদী ও অর্পিত সম্পত্তি আইনের সুযোগে জমির অন্যায় দখল বেদখল বন্ধ করা হবে।
৬। সকল ধরনের সিলিং উদ্ধৃত্ত জমি ও অন্যান্য খাস জমি কেবলমাত্র ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন সেলামীতে স্থানীয় বন্দোবন্ত দেয়া। এভাবে গঠিত সমবায়সমূহ যাতে স্বনির্ভর ও লাভজনকভাবে পরিচালিত হওয়ার শক্তি অর্জন করতে পারে সে জন্য প্রথম অবস্থায় নির্দিষ্ট কয়েক বছর তাদেরকে পর্যাপ্ত পুঁজি, উপকরণ প্রভৃতি প্রদান করা।
৭। যে বর্গাচাষী যে জমিতে পূর্ববর্তী বছর নিজে চাষ করেছে সেই জমির উপর তার বর্গস্ত¡ অর্থাৎ সেই জমিস্থায়ীভাবে চাষ করার অধিকার প্রদান করা হবে। এই অনুযায়ী প্রত্যেক বর্গাদারের নাম তালিকাভূক্তির ব্যবস্থা করা।
৮। বর্গাচাষী বর্গাজমির উৎপাদিত ফসল ও উপজাত দ্রব্যের দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চ ফলনশীল ফসলের ক্ষেত্রে তিন চতুর্থাংশ পাবে। জমির মালিক সকল উপকরণের খরচ বহন করলে ফসল ও উপজাত আধাআধি ভাগ করা।
৯। পুনর্বন্টনকৃত উদ্বৃত্ত ও খাস জমিতে নতুন ধরনের উৎপাদন সমবায় প্রতিষ্ঠিত করার কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে। বর্গাচাষী ও গরীব চাষীদের জমি এই সব সমবায়ে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করা। দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এসব সমবায়ে ক্রমান্বয়ে মাঝারি কৃষক সহ অন্যান্যদেরকেও যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা।
১০। উপরোক্ত সমবায়গুলো গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষক সমাজকে নিয়ে নানা ধরনের সমবায় গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেয়া। সমবায়েরর বর্তমান ধারা পদ্ধতি পরিবর্তন করে ধাপে ধাপে উন্নত ধরনের সমবায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেয়।
১১। ক্ষেতমজুরদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
১২। সংগঠন করার যৌথ দরকষাকষির অধিকার সহ ক্ষেতমজুরদের পূর্ণ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান করা।
১৩। ক্ষেতমজুর স্বার্থে কৃষি শ্রম আইন প্রণয়ণ করা।
১৪। ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের খরচ অনুপাত (সার্ভিস চার্জ) কৃষি ঋণের জন্য সরল ও স্বল্প সুদের হার নির্ধারণ করা।
১৫। ক্ষেতমজুর বর্গাচাষী, ভূমিহীন ও গরীব চাষীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা।
১৬। কৃষির আধুনিকীকরনের লক্ষ্যে শ্রমঘন ও উপযুক্ত প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ করা।

ট. জাতীয় সম্পদ
১. তেল ও গ্যাস বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের নিয়ে যৌথ কনভেনশন ডেকে জাতীয় গ্যাস ও তেল নীতিমালা তৈরি করা।
২. পিএসসি চুক্তি এমনভাবে করা যাতে তা জাতীয় ক্ষমতায় প্রতিবন্ধক না হয়ে পরিপূরক হয়।
৩. বিদেশী কোম্পানী নিয়োগের ক্ষেত্যে দেশীয় পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধানী সংস্থা বাপেক্সকে ক্যারিড ইন্টারেস্টের ভিত্তিতে অংশীদার হিসেবে নেয়াকে বাধ্যতামূলক করা।
৪. কয়লা, কঠিন শিলা, চিনামাটি, চুনাপাথর, কালোসোনা ইত্যাদি খনিজ সম্পদের ব্যাপক অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগসহ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।
৫. প্রকৃতির অবদানকে যথাসম্ভব সমাজের কাজে লাগানোর জন্য সকল প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া।
৬. বনজ সম্পদ যথা বৃক্ষ, বন্য পশু-পাখি ইত্যাদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া। ভেষজবিদ্যা সংক্রান্ত সকল প্রকার গাছ-গাছড়ার রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদনের ব্যবস্থা করে ্ওষধ শিল্প প্রসারের ব্যবস্থা করা।
৭. বাংলাদেশের প্রধানতম প্রাকৃতিক সম্পদ পানি সম্পদ উন্নয়নে জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৮. ক. খরস্রোতা নদী ও সেচপ্রকল্প সমূহে জল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলাকে উৎসাহিত করা।
খ. পানি সম্পদ উন্নয়নে বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা।

ঠ. শিক্ষা
১. সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রয়ি উদ্যাগ গ্রহণ করা।
২. মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা।
৩. শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজিত নৈরাজ্য-বিশৃংখলা বৈষম্য দূর করে সারাদেশে এক ও অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।
৪. জাতীয় ইতিহাস ও চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞান মনস্কতা, যুক্তিশীলতা ভিত্তিক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা।
৫. আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
৬. কম্পিউটার শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।

ড. সংস্কৃতি
১. মানুষের সমগ্র জীবন ও জীবন সংগ্রামই হচ্ছে সংস্কৃতি-এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষিত মানুষের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সংস্কৃতি গড়ে তোলার সামাজিক উদ্যোগকে উৎসাহ প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
২. সারা দুনিয়ার বাঙালি ও বাংলা ভাষার তীর্থভূমি বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ-এই নীতিমালা থেকে বাঙালির ভাষা ও সং®কৃতিকে স্বকীয় বৈশিষ্টে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৩. বাংলা ভাষার বিকাশ, বাংলা সাহিত্যের প্রসার, শিল্প-চারু-কারু কলার উন্নয়নের জাতীয় চেতনা-ঐতিহ্যিক চেতনাকে ভিত্তি হিসাবে পৃষ্ঠপোষকতা দান।
৪. লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন সাহিত্য (লোকজ খেলাধুলা, লোকজ গান-নাচ, লোকজ শিল্প, লোকজ সাহিত্য ইত্যাদি) সংরক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা ও বিকশিত করা।
৫. প্রাচীন স্থাপত্য-ভাস্কর্য, পুঁথি, প্রতœউপকরণ ইত্যাদিকে জাতীয় সম্পদ হিসাবে গণ্য করে এগুলোর পাচার-ধ্বংস-বিকৃতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।
৬. সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, সিনেমা নন্দন শিল্পের ইত্যাদি সকল শাখার ব্যাপক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দান।
৭. সম্ভোগ ও নৃসংশতার সংস্কৃতি, পশ্চিমা ভোগবাদী বিকৃত সংস্কৃতি, সমষ্টিগত সামাজিক ও পারিবারিক চেতনা বিরোধী সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থপরতার সংস্কৃতি, ধর্মান্ধ পশ্চাদপদ সাম্প্রদায়িয়ক সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা। সকল প্রকার অশ্লীল বই, পত্রিকা, সিনেমা, নাচ, গান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা।
৮. জনগণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে অনুকরণীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সাম্প্রদায়িকতা-অবৈধ ক্ষমতা দখল-লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সং®কৃতিকে উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা।
৯. সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণা দূর করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, বিজ্ঞান চর্চা, মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটানো এবং জনগণের সৃজনশীল কর্মকান্ডকে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দান।

ঢ. শ্রম নীতি
১. ইপিজেড সহ সকল শিল্প কলকারখানায় প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মচারী, কৃষি শ্রমিক-মজুর সহ শ্রমজীবিদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত করা।
২. সকল সেক্টরে শ্রমিক-কর্মচারী-মজুর-শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরি চালু করা।
৩. আইএলও কনভেনশন এবং জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ভিত্তিতে শ্রমিক-কর্মচারী-মজুরদের অধিকার নিশ্চিত করা।
৪. নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সমকাজে সম মজুরি নিশ্চিত করা।
৫. শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্র স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ করা।
৬. শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক বীমা করা।
৭. ব্যবস্থাপনায় শ্রমকদের অংশগ্রহণের অধিকার প্রদান করা।
৮. শ্রম আইন লংঘনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা।

ণ. নারী ও শিশু
১. বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক পুঁজিবাদী মূল্যবোধের বিপরীতে সমাজ-রাষ্ট্র-প্রশাসনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রদান করা। নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক নীতিমালাকে বাস্তবে প্রয়োগের উদ্যাগ গ্রহণ করা।
২. নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক-সামাজিক-প্রশাসনিক-রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা।
৩. স্থানীয় সরকার নির্বাচিত নারী সদস্যদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করা। জাতীয় সংসদের সরাসরি ভোটে নারী প্রতিনিধি নির্বাচন করা। রাজনৈতিক দালের কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।
৪. পরিবার-সমাজ-কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নানা ধর্মী অপব্যাখ্যা ও ফতোয়ার মাধ্যমে নারীর জীবন ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি মূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৫. কাজ-মজুরি-নিয়োগ-পদোন্নতিতে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা।
৬. সকল কর্মক্ষেত্রে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা।
৭. সিডও সনদের ভিত্তিতে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা পরিমার্জন করা এবং বিদ্যমান আইনসমূহের অসঙ্গতি দূর করা, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
৮. শিশুদের অস্তিত্ব রক্ষা, বিকাশ, উন্নয় ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ভিত্তিতে জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা।
৯. শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ।
১০. ছিন্নমূল শিশুদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিপালন ও পুনর্বাসন করা।

ত. জনস্বাস্থ্য চিকিৎসা
১. জনগণের স্বাস্থ্য একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। জনগণের সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুনিশ্চিত এবং আধুনিকায়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই নীতি কার্যকর করতে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া।
২. সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাকে আরও গণমুখী ও গণতন্ত্রায়ণ করা।
৩. বেসরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যপদ্ধতি রাষ্ট্রীয় নীতি ও মনিটরিং ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা।
৪. সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য বীমা বাধ্যতামূলক করা।
৫. স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য, ঔষধ, চিকিৎসা কার্যক্রমের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এই লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বাস্থ্য, ঔষধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গঠন করা।

থ. আবাসন
জনগণের বাসস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম ‘কর্তব্য’ এই নীতির আলোকে জনগণের আবাসিক সমস্যার সমাধান করা হবে। এক্ষেত্রে ছিন্নমূল, বস্তিবাসী, গ্রামীণ ক্ষেতমজুর ও শ্রমজীবী জনগণকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

দ. ক্রীড়া
শুধু স্বাস্থ্য ও মানসিক উৎকর্ষতার ক্ষেত্রেই নয়; ভাতৃত্ব, মৈত্রী ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ-সম্পতিতে ক্রীড়াঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে জোরদার করতে সমগ্র ক্রীড়া উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও আনকূল্য দেয়া হবে।

ধ. পরিবেশ
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার প্রবণতা ও পরিবেশ দূষণ প্রক্রিয়া রোধকল্পে কার্যকর নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এ লক্ষ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নির্ধারনে রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিবেশ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গঠন করা।

ন. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী
১. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মত সমান মর্যাদা ও অধিকার দেয়া।
২. ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া।
৩. ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধনে পর্যাপ্ত সুযোগ ও উৎসাহ প্রদান করা।
৪. ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও জীবনবোধ সংরক্ষণ, লালন, বিকাশ ও উন্নয়নে পূর্ণ অধিকার ও সহযোগিতা প্রদান করা।
৫. ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান পালনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা।
৬. ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও আদিবাসীদের কৃষি, পশুপালন ও কুটির শিল্প বিকাশে সহযোগিতা করা।
৭. ৫ম, ৮ম সংশোধনী বাতিল করা। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর এবং বেদখলকৃত অর্পিত সম্পত্তি উদ্ধার করা।

প. প্রতিরক্ষা
১. জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
২. সমস্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক চেতনায় সমৃদ্ধ করে একটি সুশৃংখল ও শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা।
৩. প্রতিরক্ষা বাহিনী হবে উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী। বাহিনীর সদস্যদেরকে দক্ষ সেনা হিসেবে গড়ে উঠা ছাড়াও দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ও উৎপাদনের সাথে জড়িত করা।
৪. জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা সামনে রেখে দেশের প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক নর-নারীকে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা প্রদান করার ব্যবস্থা করা।
৫. বিডিআর, পুলিশ, আনছার, ভিডিপি ও ইত্যাদি বাহিনীসমূহকে সীমান্ত রক্ষা ও অভ্যন্তরীন শান্তি শৃংখলা নিশ্চিত করার সাথে সাথে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখার উপযোগী করে গড়ে তোলা।

ফ. পররাষ্ট্র
১। সকল জাতি ও রাষ্ট্রের নিজ নিজ বিকাশের প্রয়োজনে সমমর্যাদা ও সমঅংশীদারিত্বের ভিত্তিতে উপআঞ্চলিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা গড়ে তোলা।
২। সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সকল জাতিরাষ্ট্রের জাতীয় বিকাশের ন্যায্যতাকে সমর্থন করা।
৩। পারমানবিক অস্ত্রমুক্ত নিরাপদ শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে একাত্মতা পোষন করা।
৪। যুদ্ধ নয় শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সকল দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সমস্যাবলী সমাধান করা।
৫। দক্ষিণ-দক্ষিণ বা ৭৭ জাতি গ্রুপের আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করা।

প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জিয়াউল হক মুক্তা কর্তৃক জাসদ কেন্দ্রীয় দফতর
৩৫-৩৬, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত
প্রকাশকাল: ১৬/০৬/২০১৬ইং