বাংলাদেশে শরিকানা নিয়ে বিবাদ বহু পুরোনো। যেদিন থেকে উত্তরাধিকার প্রথা চালু হয়েছে, সেদিন থেকেই শরিকানার মামলা শুরু। বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জে জমিজমা নিয়ে যে লাখ লাখ মামলা, তারও উৎস এই মালিকানা। একজন গায়ের জোরে মালিকানার বেশি ভোগ করলে আরেকজন বঞ্চিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক।

জমির মালিকানা নির্ধারণে আইন আছে, কাগজপত্র আছে, দাগ-খতিয়ান আছে। কিন্তু রাজনীতির মালিকানাটি কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে? জনগণই যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক, সেহেতু জনগণেরই ঠিক করার কথা কে কতটুকু মালিকানা পাবেন, বা পাবেন না। কিন্তু রাজনীতির মালিকেরা সেই জনগণকে খুব কমই পাত্তা দেন। তাঁরা যেকোনো মূল্যে একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে সেটাকেই মুরসি পাট্টা মনে করেন। আবার ক্ষমতার বাইরে থাকলে সেটাকে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেন।

হঠাৎ ক্ষমতার রাজনীতিতে উত্তাপ এসেছে কুষ্টিয়া থেকে। কুষ্টিয়া জাসদের নেতা হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগের নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ উভয়ের জন্মস্থান। একসময় কুষ্টিয়া ছিল রক্তাক্ত জনপদ। গণবাহিনী ও সর্বহারাদের ঘাঁটি। এখন সেটি না থাকলেও রাজনৈতিক বিভাজনটা রয়েই গেছে।

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের সাংসদ তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি কুষ্টিয়ার মিরপুরে আয়োজিত দলের সভায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনি (আওয়ামী লীগ নেতা) আশি পয়সা। আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন আর ইনু মিললে এক টাকা হয়। আমরা যদি না থাকি, তাহলে আশি পয়সা নিয়ে রাস্তায় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরবেন। এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জাসদ করি, কিন্তু দলবাজি করি না, পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করি না। মারামারি চাই না, আমি শান্তি চাই। তাই বলে জাসদের এটাকে দুর্বলতা ভাববেন না। জাসদের শক্তি আছে, লাঠি আছে। আমরা যদি মনে করি, জাসদের লাঠি যে রাস্তায় যাবে, সেই রাস্তায় আর কেউ থাকবে না।’ তাঁর এই লাঠি-দর্শনের পেছনে কারণ হলো কয়েক দিন আগে সেখানে আওয়ামী লীগের সভা থেকে জাসদ ও হাসানুল হক ইনুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অনেক কথা বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার বলে গালমন্দ করেছেন। ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।

কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগ ও জাসদের ঝগড়াটা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ঢাকায় ফিরে তথ্যমন্ত্রী বৃহস্পতিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা ৯৯ পয়সা অথবা ৮০ পয়সার মালিক হয়েও ২০ পয়সা অথবা ১ পয়সার সমতুল্য শরিকদের কদর করেছেন। দাম দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘শেখ হাসিনা মহাজোট গঠন করে রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাঁর এই দূরদৃষ্টি ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের পরও কয়েকজন নেতা-নেত্রী ঐক্যকে খাটো করে বক্তব্য ও বিবৃতি দেন। ঐক্যের শরিকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।’ তাঁর বক্তব্যের জের ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, হাসানুল হক ইনুও জানেন একা নির্বাচন করলে তিনি কত ভোট পাবেন।

ভোট বা জনসমর্থন কারও সাফ কবালা দলিল নয়। এক নির্বাচনে যাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী হতে দেখেছি, পরের নির্বাচনে তিনিই ধরাশায়ী হয়েছেন। অবশ্য সেই নির্বাচনটি যদি প্রতিযোগিতামূলক হয়। একজন ছাত্রের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া খুবই সহজ। আওয়ামী লীগ ও জোটের নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ ২০১৪ সালের নির্বাচনে অতি সহজ জয় পেয়ে ভেবেছেন, আগামী নির্বাচনেও একইভাবে জয়ী হওয়া যাবে।

ক্ষমতাসীন জোটের ছোট কিংবা বড় সব শরিককে মনে রাখতে হবে, ১৯৯১ সালের পর কোনো নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। হয় নির্বাচনের আগে জোট করতে হয়েছে, না হয় নির্বাচনের পর। আওয়ামী লীগ নেতারা জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য ৩০০ আসনে একক প্রার্থী দিয়ে দেখতে পারেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা দিয়েছিলেনও। কিন্তু ফল হয়েছে মারাত্মকভাবে বিপর্যয়কর। ওবায়দুল কাদের পোড় খাওয়া রাজনীতিক। এ কারণে তিনি ফুৎকারে বিএনপিকে উড়িয়ে না দিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট রাজনীতির বৈরিতা সেই সত্তর দশক থেকে। তিয়াত্তরের নির্বাচনের আগে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যের কথা বলেছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলকে নিয়ে সরকার গঠনের কথা প্রথম বলেছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা সেই আহ্বান আমলেই নেননি। নির্বাচনে ২৯৩টি আসনে জিতেও যখন দেশটি ঠিকমতো চালাতে পারছিলেন না, তখন তাঁরা ত্রিদলীয় ঐক্য করলেন। তত দিনে পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। ফলে সেই ঐক্য কাজে আসেনি। তা ছাড়া দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রও ছিল, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যাতে স্থিতিশীল না থাকে। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল থাকলে তাদের লাভ।

হাসানুল হক একটি কঠিন সত্য কথা বলেছেন, তাঁরা যদি এক পয়সার শরিকও হন, সেই এক পয়সা ছাড়া তো এক টাকা হবে না। এক টাকা মানে ক্ষমতা। তখন ছোট-বড় সবার অবস্থাই এক হবে। ছোট শরিকেরা কেবলা বদলও করতে পারবে। কিন্তু বড় শরিকের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে আ স ম রবও এক পয়সার শরিক ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও পাঁচ পয়সার শরিক ছিলেন। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করে আসন ১৪৬ থেকে নেমে ৬২তে এনেছিল।

ক্ষমতায় থাকলে বড় রাজনৈতিক দলগুলো জোটের মর্ম বোঝে না। জোটের মর্ম বোঝে বিরোধী দলে থাকলে। বিএনপি-জামায়াত আমলে অওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যখন জোট গঠিত হয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল একসঙ্গে তারা আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন করবেন। সেই জোটেরও সবাই বর্তমান ১৪দলীয় জোটে নেই।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনু সাহেবকে যে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সেটি তিনি নিজেও মনে রাখবেন আশা করি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট না করলে ইনু সাহেব বড় জোর আসন ও মন্ত্রিত্ব হারাবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের আসন কততে নামবে, একবার চিন্তা করে দেখুন।

বাংলাদেশে জোট রাজনীতির ইতিহাস খুব সুখকর নয়। ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট টেকেনি। ষাটের দশকে কপ (কম্বাইন্ড অপজিশন) কিংবা আট দলীয় জোট টেকেনি। সত্তরের দশকের ত্রিদলীয় জোটকে নিয়ে একদল করতে গিয়ে সর্বনাশ হয়েছে। আশির দশকের ১৫ দলীয় জোট আগাগোড়া অটুট থাকলে আজ স্বৈরাচারকে নিয়ে সরকার গঠন করতে হতো না।
তাই জোটের রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে বড় দলের ‘আমিত্ব’ পরিহার করতে হবে। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করে আরেকবার জনপ্রিয়তা যাচাই করে দেখতে পারে। তবে যতক্ষণ সেটি না করছে, ততক্ষণ শরিকদের ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা দিতে হবে।

News Source : www.prothom-alo.com